লবণচাষিদের পৌষ মাস
তাপপ্রবাহে পুড়ছে দেশ। ক্ষতির মুখে পড়েছে নানা ধরনের ফল-ফসল। তাই বৃষ্টির আশায় চাতক পাখির মতো আকাশের পানে চেয়ে আছে দেশের বেশিরভাগ মানুষ। কিন্তু উল্টো চিত্র কক্সবাজারের লবণচাষিদের।
চলমান তাপপ্রবাহ তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। মৌসুমের এখনো ১৭ দিন বাকি থাকলেও ইতিমধ্যেই সর্বোচ্চ লবণ উৎপাদনের রেকর্ড হয়েছে সেখানে। তাই তীব্র গরম উপেক্ষা করেই উপকূলের লবণচাষিরা মাঠে স্বাভাবিকভাবে কাজ করছেন। কক্সবাজার বিসিক সূত্র জানায়, চলতি লবণ মৌসুমে কক্সবাজারের আট উপজেলা ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে চাষকৃত মোট লবণ জমির পরিমাণ ৬৮ হাজার ৩৫৭ একর। গত বছর ছিল ৬৬ হাজার ৪২৪ একর। গত বছরের তুলনায় এ বছর লবণ চাষের জমি বৃদ্ধি পেয়েছে ১ হাজার ৯৩৩ একর। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি বৈশাখ মাসের শেষ দিন পর্যন্ত লবণ উৎপাদন অব্যাহত থাকতে পারে। অবশ্য চলতি মৌসুমে (২৮ এপ্রিল পর্যন্ত) ২২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৫৮ টন লবণ উৎপাদন হয়েছে; যা গত সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। এর আগে গত বছর (২০২২-২৩ অর্থবছর) সবচেয়ে বেশি লবণ উৎপাদন হয়েছিল। সে সময় পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদনের রেকর্ড ছিল ২২ লাখ ৩২ হাজার ৮৯০ টন। চলতি মৌসুমে বেড়েছে লবণচাষির সংখ্যাও। এবার ৪০ হাজার ৬৯৫ জন চাষি লবণ উৎপাদন করছেন, যা গত বছর ছিল ৩৯ হাজার ৪৬৭ জন। কক্সবাজার বিসিকের তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে পর্যন্ত পাঁচ মাস) কক্সবাজার সদর, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়া, টেকনাফ, ঈদগাঁও, রামু ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৩ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ রিদুয়ানুর রশিদ জানান, গত কয়েক দিন কক্সবাজার উপকূলের লবণ চাষ এলাকায় দৈনিক ৩০-৩৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হচ্ছে। গত মৌসুমে এ সময়ে দৈনিক সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিল ৩০ হাজার মেট্রিক টন। এবার মৌসুমের সর্বোচ্চ লবণ উৎপাদন হয়েছে গত তিন-চার দিন।
পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়নের লবণচাষি মো. হুমায়ান কবির বলছেন, ১০-১৫ দিন এমন অবস্থা বিরাজ করলে ৭ থেকে ৮ লাখ মেট্রিক টন লবণ (দৈনিক ৩০-৩৫ হাজার টন ধরে) উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তাপপ্রবাহ আমাদের লবণচাষিদের আশীর্বাদে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কোনো কারণে কালবৈশাখীর তান্ডব কিংবা বৃষ্টি হলে লবণ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এক দিনের বৃষ্টিতে প্রায় এক সপ্তাহ লবণ উৎপাদন বন্ধ থাকে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলার পেকুয়া, কুতুবদিয়া, সদর উপজেলা, ঈদগাঁও, টেকনাফ, চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন উপকূলে চলতি সপ্তাহ জুড়ে মাঠপর্যায়ে প্রতি মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকায়। পরিবহন ও ঘাটের টোল পরিশোধে মণপ্রতি খরচ পড়ে ৩০-৪০ টাকা। এতে প্রান্তিক পর্যায়ের চাষিরা মণপ্রতি লবণের দাম পাচ্ছেন ৩০০ টাকা করে।
কুতুবদিয়া উপজেলার উত্তর ধুরং ইউনিয়নের লবণচাষি মো. সাহেদ বলেন, ‘তীব্র তাপপ্রবাহ চলমান থাকলেও আমাদের মাঝে কোনো দুঃখ নেই। এখন যেভাবে চলছে তা আরও কিছু দিন বিদ্যমান থাকলে চাষিরা লাভের মুখ দেখবেন বলে আশা রাখছি।’
মহেশখালীর মাতারবাড়ী এলাকার লবণচাষি জসিম উদ্দিন ও পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়নের লবণচাষি আলাউদ্দিন বলেন, তীব্র গরমে লবণের বাম্পার উৎপাদন হচ্ছে। দুই দিন পরপর লবণ ওঠানো যাচ্ছে। তীব্র গরমে লবণের ভালো উৎপাদন হয় আর লবণের দানাও ভালো হয়।
কক্সবাজার উপকূলীয় লবণচাষি সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব রেজাউল করিম জানান, তীব্র তাপপ্রবাহে প্রান্তিক পর্যায়ের চাষিরা কষ্ট করে লবণ উৎপাদন অব্যাহত রাখলেও মাঠপর্যায়ে লবণের দাম একটি সিন্ডিকেটের কবজায়। তারাই লবণের দাম একেক সময় একেক রকম নির্ধারণ করে। চলতি লবণ মৌসুমের শুরুতে গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে ৫০০ টাকা মণ লবণ বিক্রি হয়েছে। দাম ভালো পাওয়ায় কয়েক বছর চাষ ছেড়ে দেওয়া অনেকেই আগ্রহ নিয়ে মাঠে নামে। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে হঠাৎ প্রতি মণ লবণের দাম এসে দাঁড়ায় ৩০০-৪০০ টাকায়। চাষিদের দাবি ছিল, মাঠপর্যায়ে প্রতি মণ লবণের দাম পুরো মৌসুম জুড়ে ৫০০ টাকা নির্ধারণ থাকুক। কিন্তু দালাল ফড়িয়াদের কারণে মাঠপর্যায়ে চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না।

Comments
Post a Comment